প্রচ্ছদ > জাতীয় >

দেশে জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে না পারলে স্থায়ী সমাধান আসবে না: প্রতিমন্ত্রী অমিত

article-img

কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সেলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি পুরোপুরি সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সেটি আবারও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এছাড়াও তার মতে, দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন না বাড়ালে বর্তমান জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

মঙ্গলবার ঢাকা ক্লাবে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।

জুলাইয়ের শেষ দিকে ত্রুটির কারণে টার্মিনালটি থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর গত বৃহস্পতিবার এর কার্যক্রম আংশিকভাবে পুনরায় চালু করা হয়।

টার্মিনালটির বাকি অংশ সচল করে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে বর্তমানে চালু থাকা অংশটিও কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তবে কোন সময়ে টার্মিনালটি বন্ধ রাখলে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য গ্রাহকের ওপর সবচেয়ে কম প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে এক্সেলারেট এনার্জির সঙ্গে আলোচনা চলছে।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘এক্সেলারেট এনার্জি পরিচালিত এফএসআরইউতে সমস্যার কারণে দেশে গ্যাস সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় টার্মিনালটির কার্যক্রম আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এর একটি অংশ এখন চালু রয়েছে। তবে অন্য অংশটি এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি। দ্বিতীয় অংশটি সচল করতে গেলে বর্তমানে চলমান অংশটিও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি সময় নির্ধারণের চেষ্টা করছে, যখন টার্মিনালটি বন্ধ রাখলেও সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন খাতের ওপর ভোগান্তি তুলনামূলকভাবে কম হবে। সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে টার্মিনালটিকে আবার পূর্ণ সক্ষমতায় নিয়ে আসা।

একটি টার্মিনালের সমস্যায় বড় সংকট

সেমিনারে একই প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, একটি এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর পুরো দেশে গ্যাস সরবরাহের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় আগে থেকেই বিকল্প অবকাঠামো থাকা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন তিনি। আগের সরকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনার সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়নের নামে এমন জায়গায় বিনিয়োগ হয়েছে যেখানে অর্থ খরচের সুযোগ ছিল। কিন্তু কোথায় অবকাঠামো করলে উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে, সেদিকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।’

একটি টার্মিনালে সমস্যা হলেই সারা দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার ঘটনাকে সেই দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

বড় এলএনজি টার্মিনালে বিদেশি আগ্রহ

দেশে নতুন ও বৃহৎ পরিসরের এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে একটি বিদেশি বেসরকারি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তবে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেননি।

অমিত বলেন, ‘উদ্যোক্তা গোষ্ঠীটির প্রতিনিধিরা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা বড় পরিসরে এলএনজি টার্মিনাল করতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। সরকার তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব চেয়েছে।’

বর্তমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি, গ্রহণ ও সরবরাহের অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও সেমিনারে গুরুত্ব পায়।

জিটুজি পদ্ধতিতে নতুন এফএসআরইউ

নতুন একটি এফএসআরইউ প্রকল্প নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান, কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির প্রকল্প সরাসরি অনুমোদন করা হয়নি। তার ভাষ্য, ‘সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রকল্পটি সরকার পর্যায়ে বা জিটুজি পদ্ধতিতে করা হবে। এই পদ্ধতিতে সরকার অন্য দেশের সরকার বা সরকার-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে যারা আগ্রহ দেখিয়েছিল, তাদের মধ্যে জিটুজি পদ্ধতিতে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এরপর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা ধরে প্রক্রিয়া এগোনো হয়েছে।’

প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজন থেকেই সরকার জিটুজি পদ্ধতি বেছে নিয়েছে বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে বিস্তারিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পাওয়ার পর দরকষাকষি হবে এবং আলোচনা সন্তোষজনক হলে চুক্তির দিকে এগোনো হবে।

গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর

দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন না বাড়ালে বর্তমান জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মার্চে দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাবে জ্বালানির দামও বাড়ানো হয়। এর কিছুদিন পর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে যাওয়ায় দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়।

এ প্রসঙ্গে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব না হলে নানা ধরনের আলোচনা ও উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদে সংকটের সমাধান হবে না।

তিনি বলেন, ‘সরকার আশা করছে, আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো এবার বাংলাদেশের ‘অফশোর ব্লকে’ আগ্রহ দেখাবে। বাংলাদেশের অতীতে সফল অফশোর বিডিং রাউন্ডের অভিজ্ঞতা রয়েছে।’

সমুদ্রের পাশাপাশি স্থলভাগেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন দরপত্র দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি। যত দ্রুত সম্ভব এ প্রক্রিয়া শুরু করার কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী।

হিউস্টনে গিয়ে বিদেশি কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানাতে চান টুকু

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করে তুলতে সরাসরি প্রচারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

তিনি জানান, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে। তিনি হিউস্টনে গিয়ে বড় বড় তেল-গ্যাস কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে চান। সেখানে বাংলাদেশের অফশোর ব্লকের দরপত্রে অংশ নিতে কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। মন্ত্রী মনে করেন, বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে সরাসরি তুলে ধরা জরুরি।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ

রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘শুধু নতুন যন্ত্রপাতি কিনে দিলেই বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়বে না। প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের দীর্ঘমেয়াদী কারিগরি প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।’

অতীতে বাপেক্সের কর্মকর্তাদের সাত থেকে ১০ দিনের জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এত কম সময়ে বাস্তব কাজ শেখার সুযোগ থাকে না। এ কারণে বাপেক্স কর্মকর্তাদের ছয় মাস থেকে দুই বছর মেয়াদী বিভিন্ন সার্টিফিকেট কোর্সে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

বিদেশি তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোতে অনেক বাংলাদেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ পেলে বাপেক্সের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারাও দেশের জন্য আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।

জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বৈঠকের প্রস্তাব

জ্বালানি খাতের সংকট নিয়ে শিল্পোদ্যোক্তাদের পাশাপাশি দেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন জ্বালানিমন্ত্রী টুকু। সেমিনারে আলোচকদের বক্তব্য শোনার পর তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এমন একটি বৈঠকের প্রস্তাব দেবেন।

তার মতে, দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট, ভবিষ্যতের অবকাঠামো পরিকল্পনা এবং দেশীয় জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত সরাসরি শোনা প্রয়োজন।